বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নাফিজদের ২২ ফ্ল্যাটসহ সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ

 

 

পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহিদ ও ছেলে চৌধুরী রাহিব সাফওয়ান সরাফাতের ২২টি ফ্ল্যাট, বিভিন্ন স্থানে থাকা প্লট ও জমি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এই নির্দেশ দেন।

একই আদালত সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের তিনটি ব্যাংক হিসাব এবং অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন। এ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগ, টাঙ্গাইলের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তাহমিনা তামান্না রুমার নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দ এবং জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেনের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এসব আদেশ দেন।

এদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. সাইফুজ্জামান (শিখর) ও তাঁর স্ত্রী সিমা রহমানের নামে পৃথক দুটি এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে গতকাল মামলা করেছে দুদক।

 

আদালত ও দুদক সূত্র জানায়, আদালতে গতকাল চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আবেদন করেন দুদকের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ক্রোকের আদেশ দেন বলে জানান দুদকের বিশেষ পিপি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।

ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে নাফিজ সরাফাতের নামে গুলশানের ২০ তলা একটি বাড়ি; গুলশানের একটি, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট বাজারের চারটি, নিকুঞ্জ উত্তর আবাসিক এলাকায় তিনটি ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটের ৫০ শতাংশ; নিকুঞ্জের একটি প্লট, বাড্ডার কাঁঠালদিয়ায় আড়াই কাঠা জমি, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ১০ কাঠা করে ২০ কাঠা জমি, গাজীপুর সদরে ৮.২৫ শতাংশ জমি, জোয়ার সাহারায় নিকুঞ্জে ৪.৯৫ শতাংশ জমি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে সাড়ে ৭ কাঠার প্লট। তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চারতলা বাড়িসহ সাড়ে সাত কাঠা জমি, পান্থপথে একটি, গুলশানে দুটি, মিরপুর ডিওএইচএসে একটি, শাহজাদপুরে একটি ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের ৫০ শতাংশ, নিকুঞ্জে তিন কাঠা জমি, বাড্ডার কাঁঠালদিয়ায় আড়াই কাঠা নাল জমি ও গাজীপুর সদরে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ চালা জমি এবং ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাতের নামে বনানীতে থাকা তিনটি ও বারিধারায় থাকা চারটি ফ্ল্যাট।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, নাফিজ সরাফাত ও অন্যদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা ও নিজেদের মাধ্যমে একে অপরের যোগসাজশে প্রায় ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে পলাতক রয়েছেন। স্থাবর সম্পত্তিগুলো জ্ঞাত/বৈধ আয়বহির্ভূতভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ: দুদকের উপপরিচালক মোহা. নুরুল হুদার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই আদালত সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও ময়মনসিংহ-২ আসনের সাবেক এমপি শরীফ আহমেদের তিনটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন। আবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর নামের দুটি হিসাবে ১ কোটি করে ২ কোটি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকে থাকা অপর হিসাবে ১ কোটি ৪৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৭০ টাকা আছে।

গণপূর্তের আলমগীরের স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ: একই আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত বিভাগ, টাঙ্গাইলের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তাহমিনা তামান্না রুমার নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন। আলমগীরের স্থাবর সম্পদের মূল্য ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেন এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন।

শিখর দম্পতি ও আবুল কালাম আজাদের নামে মামলা: দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ তিন কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান শিখর ও তাঁর স্ত্রী সিমা রহমানের নামে গতকাল দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব শিখরের বিরুদ্ধে করা মামলায় ১ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ৫২১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলায় ১ কোটি ১৬ লাখ ১ হাজার ৩৩২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

এ ছাড়া গাইবান্ধা-৪ আসনের সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের নামে ৬ কোটি ১০ লাখ ৫ হাজার ৬৬৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়। তাঁর স্ত্রী মোছা. রুহুল আরা রহিমের সম্পদের উৎসের সঠিকতা যাচাইয়ে তাঁর সম্পদ বিবরণী চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নাফিজদের ২২ ফ্ল্যাটসহ সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ

Update Time : ০৪:৪৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৫

 

 

পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহিদ ও ছেলে চৌধুরী রাহিব সাফওয়ান সরাফাতের ২২টি ফ্ল্যাট, বিভিন্ন স্থানে থাকা প্লট ও জমি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এই নির্দেশ দেন।

একই আদালত সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের তিনটি ব্যাংক হিসাব এবং অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন। এ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগ, টাঙ্গাইলের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তাহমিনা তামান্না রুমার নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দ এবং জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেনের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এসব আদেশ দেন।

এদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাগুরা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. সাইফুজ্জামান (শিখর) ও তাঁর স্ত্রী সিমা রহমানের নামে পৃথক দুটি এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে গতকাল মামলা করেছে দুদক।

 

আদালত ও দুদক সূত্র জানায়, আদালতে গতকাল চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আবেদন করেন দুদকের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ক্রোকের আদেশ দেন বলে জানান দুদকের বিশেষ পিপি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর।

ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে নাফিজ সরাফাতের নামে গুলশানের ২০ তলা একটি বাড়ি; গুলশানের একটি, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট বাজারের চারটি, নিকুঞ্জ উত্তর আবাসিক এলাকায় তিনটি ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটের ৫০ শতাংশ; নিকুঞ্জের একটি প্লট, বাড্ডার কাঁঠালদিয়ায় আড়াই কাঠা জমি, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ১০ কাঠা করে ২০ কাঠা জমি, গাজীপুর সদরে ৮.২৫ শতাংশ জমি, জোয়ার সাহারায় নিকুঞ্জে ৪.৯৫ শতাংশ জমি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে সাড়ে ৭ কাঠার প্লট। তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চারতলা বাড়িসহ সাড়ে সাত কাঠা জমি, পান্থপথে একটি, গুলশানে দুটি, মিরপুর ডিওএইচএসে একটি, শাহজাদপুরে একটি ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের ৫০ শতাংশ, নিকুঞ্জে তিন কাঠা জমি, বাড্ডার কাঁঠালদিয়ায় আড়াই কাঠা নাল জমি ও গাজীপুর সদরে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ চালা জমি এবং ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাতের নামে বনানীতে থাকা তিনটি ও বারিধারায় থাকা চারটি ফ্ল্যাট।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, নাফিজ সরাফাত ও অন্যদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা ও নিজেদের মাধ্যমে একে অপরের যোগসাজশে প্রায় ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে পলাতক রয়েছেন। স্থাবর সম্পত্তিগুলো জ্ঞাত/বৈধ আয়বহির্ভূতভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ: দুদকের উপপরিচালক মোহা. নুরুল হুদার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই আদালত সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও ময়মনসিংহ-২ আসনের সাবেক এমপি শরীফ আহমেদের তিনটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন। আবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর নামের দুটি হিসাবে ১ কোটি করে ২ কোটি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকে থাকা অপর হিসাবে ১ কোটি ৪৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৭০ টাকা আছে।

গণপূর্তের আলমগীরের স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ: একই আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত বিভাগ, টাঙ্গাইলের সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তাহমিনা তামান্না রুমার নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন। আলমগীরের স্থাবর সম্পদের মূল্য ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেন এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন।

শিখর দম্পতি ও আবুল কালাম আজাদের নামে মামলা: দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ তিন কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান শিখর ও তাঁর স্ত্রী সিমা রহমানের নামে গতকাল দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব শিখরের বিরুদ্ধে করা মামলায় ১ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ৫২১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলায় ১ কোটি ১৬ লাখ ১ হাজার ৩৩২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

এ ছাড়া গাইবান্ধা-৪ আসনের সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের নামে ৬ কোটি ১০ লাখ ৫ হাজার ৬৬৮ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়। তাঁর স্ত্রী মোছা. রুহুল আরা রহিমের সম্পদের উৎসের সঠিকতা যাচাইয়ে তাঁর সম্পদ বিবরণী চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।