শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পুলিশের গুলিতে নিহত হৃদয় মিয়ার পরিবারে নেমে এসেছে অসহায়ত্বের ছায়া

নুসরাতের বয়স মাত্র দেড় বছর, আর আব্দুল্লাহ’র সাড়ে তিন। এতটুকু বয়সেই বাবাহারা এই দুই অবুঝ শিশু। প্রতিদিন রাতে তারা বাবার অপেক্ষায় থাকে, বাবার সাথে ঘুমাতে চায়। সকালে ঘুম ভাঙলে বাবাকে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এই এতিম ভাইবোন। তাদের মা, শিরিনা আক্তার, স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশু সন্তান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। স্বামী বা বাবার বাড়িতে আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় সন্তানদের ভরণপোষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।

গত ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ মোড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের হৃদয় মিয়া। তিনি ছফেদ আলীর ছেলে ছিলেন। জানা যায়, বাবা-মায়ের দাম্পত্য দ্বন্দ্বের কারণে ছোটবেলা থেকেই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের হাউজিং এলাকায় নানীর কাছে থাকতেন হৃদয়। ২০২০ সালে ভালোবেসে শিরিনা আক্তারকে বিয়ে করেন। পেশায় সিলিং মিস্ত্রি হৃদয় মিয়া দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছিলেন।

ঘটনার দিন সকালে কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলেও রাতে ফিরেন লাশ হয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন বিকাল ৫টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন হৃদয়। আসার পথে সিদ্ধিরগঞ্জ মোড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। এসময় বিপরীত পাশ থেকে ছোঁড়া পুলিশের গুলি এসে লাগে হৃদয়ের কপালে। তৎক্ষণাৎ সড়কে লুটিয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা উদ্ধার করে নিয়ে আসলেও বাঁচানো যায়নি তাকে। পুলিশের ভয়ে প্রতিবেশীরা রাতেই সিদ্ধিরগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কবরস্থানে তাকে দাফন করেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হৃদয়কে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার। স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার ভাড়া বাসায় উঠলেও অসুস্থ বাবার পরিবারে যেন বোঝা হয়ে রয়েছেন। কোনো উপার্জন না থাকায় অভাব-অনটনে দিন কাটছে তার। এছাড়া, বাবাকে দেখতে প্রতিদিন আবদার করে সন্তানরা। চায় মজাদার খাবার। অবুঝ সন্তানদের আবদার মেটাতে না পারায় কষ্টের শেষ নেই শিরিনার।

শহীদ হৃদয়ের স্ত্রী শিরিনা আক্তার বলেন, “আমার স্বামীর কলিজা ছিল তাঁর দুই সন্তান। প্রতিদিন কাজ থেকে ফেরার সময় তাদের জন্য ফলমূলসহ মজাদার খাবার নিয়ে আসতো। ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন। আমার ছেলে রাতে এখনো বাবার অপেক্ষা করে। বারবার জিজ্ঞাসা করে বাবা কবে আসবে। সকাল ঘুম থেকে উঠলে বাবাকে দেখতে চায় তারা। আমি এই কষ্ট আর নিতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, “হৃদয়ের পরিবারে তেমন কেউ নেই। আমার বাবার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। দুই সন্তানকে নিয়ে আমি অকূল সাগরের মধ্যে আছি। হৃদয়কে হারিয়ে আমি বড় অসহায়। আমার আর্থিক কোনো সংস্থান নেই। ছোট ছোট বাচ্চাকে রেখে কোথায় কাজ করবো? কীভাবে বাকি দিনগুলো পার করবো সেই চিন্তায় রাতদিন কাটে না।”

এদিকে, শহীদ হৃদয়ের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকার সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। সুনামগঞ্জ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা উসমান গণী বলেন, “শহীদ হৃদয় দেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। সরকারকে অবশ্যই হৃদয়ের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। হৃদয়ের পরিবার খুব মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা সব সময় তাঁর খোঁজখবর নিচ্ছি। সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকছি। আমরা দাবি করবো হৃদয়ের মতো সুনামগঞ্জের যে বাসিন্দারা আহত অথবা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে স্থায়ী পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসবে সরকার।”

অপরদিকে, শহীদ হৃদয়ের পরিবারকে ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। পরবর্তী সরকারি সকল সহযোগিতার আওতায় হৃদয়ের পরিবারকে আনার আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

পুলিশের গুলিতে নিহত হৃদয় মিয়ার পরিবারে নেমে এসেছে অসহায়ত্বের ছায়া

Update Time : ০৭:৩৬:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

নুসরাতের বয়স মাত্র দেড় বছর, আর আব্দুল্লাহ’র সাড়ে তিন। এতটুকু বয়সেই বাবাহারা এই দুই অবুঝ শিশু। প্রতিদিন রাতে তারা বাবার অপেক্ষায় থাকে, বাবার সাথে ঘুমাতে চায়। সকালে ঘুম ভাঙলে বাবাকে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে এই এতিম ভাইবোন। তাদের মা, শিরিনা আক্তার, স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশু সন্তান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। স্বামী বা বাবার বাড়িতে আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় সন্তানদের ভরণপোষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।

গত ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ মোড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের হৃদয় মিয়া। তিনি ছফেদ আলীর ছেলে ছিলেন। জানা যায়, বাবা-মায়ের দাম্পত্য দ্বন্দ্বের কারণে ছোটবেলা থেকেই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের হাউজিং এলাকায় নানীর কাছে থাকতেন হৃদয়। ২০২০ সালে ভালোবেসে শিরিনা আক্তারকে বিয়ে করেন। পেশায় সিলিং মিস্ত্রি হৃদয় মিয়া দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছিলেন।

ঘটনার দিন সকালে কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলেও রাতে ফিরেন লাশ হয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেদিন বিকাল ৫টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন হৃদয়। আসার পথে সিদ্ধিরগঞ্জ মোড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। এসময় বিপরীত পাশ থেকে ছোঁড়া পুলিশের গুলি এসে লাগে হৃদয়ের কপালে। তৎক্ষণাৎ সড়কে লুটিয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা উদ্ধার করে নিয়ে আসলেও বাঁচানো যায়নি তাকে। পুলিশের ভয়ে প্রতিবেশীরা রাতেই সিদ্ধিরগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কবরস্থানে তাকে দাফন করেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হৃদয়কে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার। স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার ভাড়া বাসায় উঠলেও অসুস্থ বাবার পরিবারে যেন বোঝা হয়ে রয়েছেন। কোনো উপার্জন না থাকায় অভাব-অনটনে দিন কাটছে তার। এছাড়া, বাবাকে দেখতে প্রতিদিন আবদার করে সন্তানরা। চায় মজাদার খাবার। অবুঝ সন্তানদের আবদার মেটাতে না পারায় কষ্টের শেষ নেই শিরিনার।

শহীদ হৃদয়ের স্ত্রী শিরিনা আক্তার বলেন, “আমার স্বামীর কলিজা ছিল তাঁর দুই সন্তান। প্রতিদিন কাজ থেকে ফেরার সময় তাদের জন্য ফলমূলসহ মজাদার খাবার নিয়ে আসতো। ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন। আমার ছেলে রাতে এখনো বাবার অপেক্ষা করে। বারবার জিজ্ঞাসা করে বাবা কবে আসবে। সকাল ঘুম থেকে উঠলে বাবাকে দেখতে চায় তারা। আমি এই কষ্ট আর নিতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, “হৃদয়ের পরিবারে তেমন কেউ নেই। আমার বাবার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। দুই সন্তানকে নিয়ে আমি অকূল সাগরের মধ্যে আছি। হৃদয়কে হারিয়ে আমি বড় অসহায়। আমার আর্থিক কোনো সংস্থান নেই। ছোট ছোট বাচ্চাকে রেখে কোথায় কাজ করবো? কীভাবে বাকি দিনগুলো পার করবো সেই চিন্তায় রাতদিন কাটে না।”

এদিকে, শহীদ হৃদয়ের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকার সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। সুনামগঞ্জ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা উসমান গণী বলেন, “শহীদ হৃদয় দেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। সরকারকে অবশ্যই হৃদয়ের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। হৃদয়ের পরিবার খুব মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা সব সময় তাঁর খোঁজখবর নিচ্ছি। সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকছি। আমরা দাবি করবো হৃদয়ের মতো সুনামগঞ্জের যে বাসিন্দারা আহত অথবা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে স্থায়ী পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসবে সরকার।”

অপরদিকে, শহীদ হৃদয়ের পরিবারকে ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। পরবর্তী সরকারি সকল সহযোগিতার আওতায় হৃদয়ের পরিবারকে আনার আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম।