বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৫৪ বছরেও উন্নয়ন বঞ্চিত হাওরের জনপদ দিরাই

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের দিরাই উপজেলা আজও মৌলিক অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে উন্নয়ন বঞ্চনার চক্রে আবদ্ধ। প্রায় ৩ লাখ মানুষের বসবাসের এ উপজেলাটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলেও সড়ক যোগাযোগহীনতা, স্বাস্থ্যসেবার অচলাবস্থা, জরুরি সেবার সীমাবদ্ধতা, পৌরসেবার দুর্বলতা ও শিক্ষাখাতের অনগ্রসরতা এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা।

দিরাই-শাল্লা আসন থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বশীল ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলেও স্থানীয় উন্নয়ন দৃশ্যমান নয় এমন অভিযোগ বহুদিনের।

জানা যায়, হাওর বেষ্টিত দিরাই-শাল্লা আসন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এছাড়া এই আসন থেকে নির্বাচিত হন, গোলাম জিলানী চৌধুরী, নাছির উদ্দীন চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তা।

হাওরবাসীর বর্ণনায়, প্রতিটি মৌসুমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা ব্যাহত হওয়া ও নিরাপত্তাহীনতা যেন দিরাইবাসীর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের কোনো ইউনিয়নেই নেই সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। বর্ষা মৌসুমে পুরো দিরাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত প্রবাদ বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও। গ্রামাঞ্চলের কেউ অসুস্থ হলে নৌকা যোগে সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে, আর অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। হাওরাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় নৌ-এম্বুলেন্স থাকার নিয়ম থাকলেও দিরাইয়ে নেই একটি নৌ-এম্বুলেন্সও।

সড়ক না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না, ফলে গ্রামবাসীদের নিজ উদ্যোগে আগুন নেভাতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল মিয়া বলেন, বর্ষা এলেই উপজেলার গ্রামগুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় ডাকাত আতঙ্কে নিজেরাই পাহারা দিতে হয়। সড়ক না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও টহল দিতে পারে না।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অন্য খাতের মতোই হতাশাজনক। ২০১৬ সালে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়ে নতুন ভবন পেলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও নার্সের সংকট কাটেনি। ফলে জরুরি রোগীদের সুনামগঞ্জ বা সিলেটে পাঠাতে হয়।

সমাজকর্মী নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই। যন্ত্রপাতি কম, ডাক্তার-নার্সের অভাব। আমরা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকি।

পৌরসভার সেবাও বহুদিন ধরে পিছিয়ে। দিরাই পৌরসভা ১৯৯৯ প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো ডাম্পিং সাইট নেই। শহরের সড়ক ভাঙাচোরা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল; ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

পৌর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, অল্প বৃষ্টি হলেই হাঁটা যায় না। এত বছর পৌরসভায় থেকেও উন্নয়নের স্বাদ পাইনি।

শিক্ষাখাতেও অনগ্রসর দিরাই। উপজেলার গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা দূরবর্তী এলাকা থেকে নৌকাযোগে যাতায়াত করেন। বর্ষায় পানি বাড়লে তাদের জীবন ঝুঁকি বাড়ে, পাঠদান ব্যাহত হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মুহিত চৌধুরী বলেন, শিক্ষার মান আশানুরূপ নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দু’জনই কষ্টে থাকে।

রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় দিরাই-শাল্লা এলাকা থেকে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জাতীয় পর্যায়ে মন্ত্রী ও শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করলেও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যকরভাবে এগোয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আমরা ভোট দিই, নেতা জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী হন, কিন্তু দিরাইবাসীর দুঃখ-দুর্দশায় কোনো পরিবর্তন আসে না।

হাওর পাড়ের মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই, প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, চাই বাস্তব উন্নয়ন। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, নৌ-এম্বুলেন্স, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, পৌরসেবা সম্প্রসারণ ও শিক্ষাখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে হাওরের এই জনপদকে পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে মুক্ত করা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

৫৪ বছরেও উন্নয়ন বঞ্চিত হাওরের জনপদ দিরাই

Update Time : ০৪:১০:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের দিরাই উপজেলা আজও মৌলিক অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে উন্নয়ন বঞ্চনার চক্রে আবদ্ধ। প্রায় ৩ লাখ মানুষের বসবাসের এ উপজেলাটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলেও সড়ক যোগাযোগহীনতা, স্বাস্থ্যসেবার অচলাবস্থা, জরুরি সেবার সীমাবদ্ধতা, পৌরসেবার দুর্বলতা ও শিক্ষাখাতের অনগ্রসরতা এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা।

দিরাই-শাল্লা আসন থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বশীল ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলেও স্থানীয় উন্নয়ন দৃশ্যমান নয় এমন অভিযোগ বহুদিনের।

জানা যায়, হাওর বেষ্টিত দিরাই-শাল্লা আসন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এছাড়া এই আসন থেকে নির্বাচিত হন, গোলাম জিলানী চৌধুরী, নাছির উদ্দীন চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তা।

হাওরবাসীর বর্ণনায়, প্রতিটি মৌসুমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা ব্যাহত হওয়া ও নিরাপত্তাহীনতা যেন দিরাইবাসীর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের কোনো ইউনিয়নেই নেই সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। বর্ষা মৌসুমে পুরো দিরাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত প্রবাদ বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও। গ্রামাঞ্চলের কেউ অসুস্থ হলে নৌকা যোগে সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে, আর অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। হাওরাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় নৌ-এম্বুলেন্স থাকার নিয়ম থাকলেও দিরাইয়ে নেই একটি নৌ-এম্বুলেন্সও।

সড়ক না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না, ফলে গ্রামবাসীদের নিজ উদ্যোগে আগুন নেভাতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল মিয়া বলেন, বর্ষা এলেই উপজেলার গ্রামগুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় ডাকাত আতঙ্কে নিজেরাই পাহারা দিতে হয়। সড়ক না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও টহল দিতে পারে না।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অন্য খাতের মতোই হতাশাজনক। ২০১৬ সালে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়ে নতুন ভবন পেলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও নার্সের সংকট কাটেনি। ফলে জরুরি রোগীদের সুনামগঞ্জ বা সিলেটে পাঠাতে হয়।

সমাজকর্মী নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই। যন্ত্রপাতি কম, ডাক্তার-নার্সের অভাব। আমরা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকি।

পৌরসভার সেবাও বহুদিন ধরে পিছিয়ে। দিরাই পৌরসভা ১৯৯৯ প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো ডাম্পিং সাইট নেই। শহরের সড়ক ভাঙাচোরা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল; ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

পৌর এলাকার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, অল্প বৃষ্টি হলেই হাঁটা যায় না। এত বছর পৌরসভায় থেকেও উন্নয়নের স্বাদ পাইনি।

শিক্ষাখাতেও অনগ্রসর দিরাই। উপজেলার গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা দূরবর্তী এলাকা থেকে নৌকাযোগে যাতায়াত করেন। বর্ষায় পানি বাড়লে তাদের জীবন ঝুঁকি বাড়ে, পাঠদান ব্যাহত হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মুহিত চৌধুরী বলেন, শিক্ষার মান আশানুরূপ নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দু’জনই কষ্টে থাকে।

রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় দিরাই-শাল্লা এলাকা থেকে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জাতীয় পর্যায়ে মন্ত্রী ও শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করলেও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যকরভাবে এগোয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আমরা ভোট দিই, নেতা জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী হন, কিন্তু দিরাইবাসীর দুঃখ-দুর্দশায় কোনো পরিবর্তন আসে না।

হাওর পাড়ের মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই, প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, চাই বাস্তব উন্নয়ন। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, নৌ-এম্বুলেন্স, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, পৌরসেবা সম্প্রসারণ ও শিক্ষাখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে হাওরের এই জনপদকে পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে মুক্ত করা জরুরি।