শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সদর হাসপাতালে চিকিৎসক ও সেবার তীব্র সংকট: রোগীরা চরম ভোগান্তিতে

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল বর্তমানে নিজেই সেবার সংকটে ভুগছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ তদারকির অভাবে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ৩৬টি চিকিৎসক এবং ৭৪টি নার্সের পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার একমাত্র ভরসাস্থলটি আজ নিজেই সমস্যাগ্রস্ত। রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন সিলেটসহ বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে, যা গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য চরম সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেবার মানহীন অবস্থা

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা এবং রোগীদের থাকার ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুতে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। ওয়ার্ডের ভিতরে রোগীরা সিট না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শিশু ওয়ার্ড, মহিলা ওয়ার্ড এবং সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীরা গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ওয়ার্ডে দুর্গন্ধ, নোংরা টয়লেট, এবং মশা-মাছির উপদ্রব রোগীদের অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তাহিরপুর উপজেলার আলেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, “আমার ৭ মাসের নাতির পাতলা পায়খানা হয়েছে। দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত সিট না থাকায় মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে ১০ জন রোগীর জায়গায় ২০ জন গাদাগাদি করে আছে। টয়লেটের অবস্থা খুবই নোংরা, দুর্গন্ধে থাকা যাচ্ছে না।”

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রহিমা বেগম জানান, “চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। এই কয়দিন সকালে শুধু ডিম, পাউরুটি আর কলা পেয়েছি। দুপুর আর রাতের খাবারে শুধু পোল্ট্রি মুরগি আর ডাল। অথচ খাদ্য তালিকায় মাছ, মুরগি, ডাল এবং সবজি থাকার কথা।”

জনবল সংকট ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৬৬ জন এমবিবিএস এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। ফলে ৩৬টি চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর মধ্যে রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি, চক্ষু, গাইনি, কার্ডিওলজি, ডেন্টাল) এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি, রেডিওলজি) পদের ঘাটতি।

এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির নার্সের ২৬৪টি পদের মধ্যে ৭৪টি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ৩৮টি পদের মধ্যে ১৯টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৮টি পদের মধ্যে ১৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি হচ্ছে। গরমের মৌসুমে রোগীর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত রোগীর জন্য আমরা ২৫০ ডিমের চেয়ে বেশি দিতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, “সার্জারি বিভাগের কোনো চিকিৎসক না থাকায় ছোট ছোট সার্জারির জন্যও রোগীদের সিলেট রেফার করতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানাই।”

টয়লেট পরিষ্কার না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না। গণপূর্ত বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তারা সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।”

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালের জনবল সংকটের কারণে সমস্যাগুলো বাড়ছে। ইতিমধ্যে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই চিকিৎসক এবং অন্যান্য শূন্য পদ পূরণ হবে এবং হাসপাতালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সদর হাসপাতালে চিকিৎসক ও সেবার তীব্র সংকট: রোগীরা চরম ভোগান্তিতে

Update Time : ০৬:০৯:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৫

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল বর্তমানে নিজেই সেবার সংকটে ভুগছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ তদারকির অভাবে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ৩৬টি চিকিৎসক এবং ৭৪টি নার্সের পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার একমাত্র ভরসাস্থলটি আজ নিজেই সমস্যাগ্রস্ত। রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন সিলেটসহ বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে, যা গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য চরম সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেবার মানহীন অবস্থা

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা এবং রোগীদের থাকার ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুতে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। ওয়ার্ডের ভিতরে রোগীরা সিট না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শিশু ওয়ার্ড, মহিলা ওয়ার্ড এবং সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীরা গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ওয়ার্ডে দুর্গন্ধ, নোংরা টয়লেট, এবং মশা-মাছির উপদ্রব রোগীদের অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তাহিরপুর উপজেলার আলেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, “আমার ৭ মাসের নাতির পাতলা পায়খানা হয়েছে। দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত সিট না থাকায় মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে ১০ জন রোগীর জায়গায় ২০ জন গাদাগাদি করে আছে। টয়লেটের অবস্থা খুবই নোংরা, দুর্গন্ধে থাকা যাচ্ছে না।”

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রহিমা বেগম জানান, “চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। এই কয়দিন সকালে শুধু ডিম, পাউরুটি আর কলা পেয়েছি। দুপুর আর রাতের খাবারে শুধু পোল্ট্রি মুরগি আর ডাল। অথচ খাদ্য তালিকায় মাছ, মুরগি, ডাল এবং সবজি থাকার কথা।”

জনবল সংকট ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৬৬ জন এমবিবিএস এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। ফলে ৩৬টি চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর মধ্যে রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি, চক্ষু, গাইনি, কার্ডিওলজি, ডেন্টাল) এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি, রেডিওলজি) পদের ঘাটতি।

এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির নার্সের ২৬৪টি পদের মধ্যে ৭৪টি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ৩৮টি পদের মধ্যে ১৯টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৮টি পদের মধ্যে ১৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি হচ্ছে। গরমের মৌসুমে রোগীর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত রোগীর জন্য আমরা ২৫০ ডিমের চেয়ে বেশি দিতে পারছি না।”

তিনি আরও বলেন, “সার্জারি বিভাগের কোনো চিকিৎসক না থাকায় ছোট ছোট সার্জারির জন্যও রোগীদের সিলেট রেফার করতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানাই।”

টয়লেট পরিষ্কার না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না। গণপূর্ত বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তারা সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।”

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালের জনবল সংকটের কারণে সমস্যাগুলো বাড়ছে। ইতিমধ্যে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই চিকিৎসক এবং অন্যান্য শূন্য পদ পূরণ হবে এবং হাসপাতালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”