শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জলাবদ্ধতায় হুমকির মুখে বোরো আবাদ: বাঁচাডুবি বিলের কৃষকদের আকুতি

শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের জামখলা হাওরের কৃষক মো. শাহীন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বোরো ধানের চাষ করছেন। প্রতি বছর ১৫-২০ কিয়ার (প্রতি কিয়ার ৩০ শতক) জমিতে আবাদ করলেও এবার এখনো ৭-৮ কিয়ার জমি চাষ করতে পারেননি। কারণ, ইউনিয়নের জামখলা হাওরে অবস্থিত বাঁচাডুবি বিল এখনো পানিতে টইটম্বুর।

ধান রোপণের উপযুক্ত সময় পার হয়ে যাওয়ায় বীজতলায় থাকা ধানের চারা নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে বিলের পাড়ে ইতোমধ্যে রোপিত চারা অতিরিক্ত পানির কারণে নষ্ট হতে বসেছে। এতে কৃষক শাহীন মিয়াসহ আশপাশের শতাধিক কৃষক গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তারা দাবি করছেন, যত দ্রুত সম্ভব বিলের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি রেখে আবাদ করা সম্ভব হয়। অন্যথায় তাদের অনেক জমিই অনাবাদি থেকে যাবে, যা কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করবে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কৃষক শাহীন মিয়া ও কামরান খানসহ ৭০ জন ভুক্তভোগী কৃষক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, বাঁচাডুবি বিলে এখনো বর্ষাকালের মতো পানি জমে আছে, যার ফলে শতাধিক একর জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছু জমিতে ধান রোপণ করা হলেও অতিরিক্ত পানির কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ অবস্থায় যদি চলতি মাসের মধ্যে বৃষ্টি হয়, তবে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে এবং কৃষকদের মৌসুমী আবাদ ব্যাহত হবে। তাই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিলের মাঝে ৩ ফুট পরিমাণ পানি রেখে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাঁচাডুবি বিল পানিতে পরিপূর্ণ, চারপাশের আবাদি জমি জলমগ্ন। এ অবস্থায় শত শত কৃষক অপেক্ষায় আছেন জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য। জামখলা হাওরের ভুক্তভোগী কৃষক কামরান খান, শাহীন মিয়া, ইস্কন্দর আলী, হান্নান মিয়া ও নূরুল ইসলাম বলেন, বিলের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা না হলে বৃষ্টিপাতের ফলে পুরো হাওর প্লাবিত হয়ে তাদের রোপিত ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকলে অনেক জমিই অনাবাদি থেকে যাবে।

এদিকে, বীজতলা প্রস্তুত করে রাখা কৃষকরা এখনো অপেক্ষায় আছেন, কখন তাদের জমি শুকিয়ে ফসল রোপণের উপযোগী হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পানি না কমায় বীজতলার ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিলের ইজারাদার দরগাপাশা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি ছানু মিয়া বলেন, “আমরা বিলের পানি কমানোর জন্য প্রস্তুত। হাওরের কৃষক ও এলাকাবাসীর সম্মতিও রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস ও মৎস্য অফিস থেকেও অনুমতি আছে। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের অনুমতি দিচ্ছেন না। যদিও আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, বাঁধ কেটে পানি বের করার পর পুনরায় তা মেরামত করা হবে, তবুও অনুমতি মেলেনি। সেচের মাধ্যমে এত বিশাল এলাকা থেকে পানি সরানো অসম্ভব। তাই ইউএনও স্যারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই পানি কমানো সম্ভব নয়।”

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। ইজারাদাররা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করতে চাচ্ছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি জেলা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেছি, কিন্তু তারা এই ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তারপরও আমি সমিতির লোকদের বলেছি, যদি তাদের কোনো বক্তব্য থাকে, তাহলে জেলা কমিটির সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”

কৃষকদের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে তাদের এবারের বোরো আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারি উদ্যোগের অভাবে যদি কৃষকদের জমি অনাবাদি থেকে যায়, তাহলে শুধু তারা নয়, সামগ্রিকভাবে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জলাবদ্ধতায় হুমকির মুখে বোরো আবাদ: বাঁচাডুবি বিলের কৃষকদের আকুতি

Update Time : ০৮:০০:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের জামখলা হাওরের কৃষক মো. শাহীন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বোরো ধানের চাষ করছেন। প্রতি বছর ১৫-২০ কিয়ার (প্রতি কিয়ার ৩০ শতক) জমিতে আবাদ করলেও এবার এখনো ৭-৮ কিয়ার জমি চাষ করতে পারেননি। কারণ, ইউনিয়নের জামখলা হাওরে অবস্থিত বাঁচাডুবি বিল এখনো পানিতে টইটম্বুর।

ধান রোপণের উপযুক্ত সময় পার হয়ে যাওয়ায় বীজতলায় থাকা ধানের চারা নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে বিলের পাড়ে ইতোমধ্যে রোপিত চারা অতিরিক্ত পানির কারণে নষ্ট হতে বসেছে। এতে কৃষক শাহীন মিয়াসহ আশপাশের শতাধিক কৃষক গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তারা দাবি করছেন, যত দ্রুত সম্ভব বিলের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি রেখে আবাদ করা সম্ভব হয়। অন্যথায় তাদের অনেক জমিই অনাবাদি থেকে যাবে, যা কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করবে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কৃষক শাহীন মিয়া ও কামরান খানসহ ৭০ জন ভুক্তভোগী কৃষক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, বাঁচাডুবি বিলে এখনো বর্ষাকালের মতো পানি জমে আছে, যার ফলে শতাধিক একর জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছু জমিতে ধান রোপণ করা হলেও অতিরিক্ত পানির কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ অবস্থায় যদি চলতি মাসের মধ্যে বৃষ্টি হয়, তবে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে এবং কৃষকদের মৌসুমী আবাদ ব্যাহত হবে। তাই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিলের মাঝে ৩ ফুট পরিমাণ পানি রেখে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাঁচাডুবি বিল পানিতে পরিপূর্ণ, চারপাশের আবাদি জমি জলমগ্ন। এ অবস্থায় শত শত কৃষক অপেক্ষায় আছেন জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য। জামখলা হাওরের ভুক্তভোগী কৃষক কামরান খান, শাহীন মিয়া, ইস্কন্দর আলী, হান্নান মিয়া ও নূরুল ইসলাম বলেন, বিলের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা না হলে বৃষ্টিপাতের ফলে পুরো হাওর প্লাবিত হয়ে তাদের রোপিত ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকলে অনেক জমিই অনাবাদি থেকে যাবে।

এদিকে, বীজতলা প্রস্তুত করে রাখা কৃষকরা এখনো অপেক্ষায় আছেন, কখন তাদের জমি শুকিয়ে ফসল রোপণের উপযোগী হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পানি না কমায় বীজতলার ধানের চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিলের ইজারাদার দরগাপাশা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি ছানু মিয়া বলেন, “আমরা বিলের পানি কমানোর জন্য প্রস্তুত। হাওরের কৃষক ও এলাকাবাসীর সম্মতিও রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস ও মৎস্য অফিস থেকেও অনুমতি আছে। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের অনুমতি দিচ্ছেন না। যদিও আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, বাঁধ কেটে পানি বের করার পর পুনরায় তা মেরামত করা হবে, তবুও অনুমতি মেলেনি। সেচের মাধ্যমে এত বিশাল এলাকা থেকে পানি সরানো অসম্ভব। তাই ইউএনও স্যারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই পানি কমানো সম্ভব নয়।”

এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। ইজারাদাররা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করতে চাচ্ছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি জেলা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেছি, কিন্তু তারা এই ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তারপরও আমি সমিতির লোকদের বলেছি, যদি তাদের কোনো বক্তব্য থাকে, তাহলে জেলা কমিটির সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”

কৃষকদের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে তাদের এবারের বোরো আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারি উদ্যোগের অভাবে যদি কৃষকদের জমি অনাবাদি থেকে যায়, তাহলে শুধু তারা নয়, সামগ্রিকভাবে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।