বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শাপলা চত্বরে নৃশংসতার ১২ বছর

০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের জমায়েত এবং পরবর্তীতে সংঘর্ষের ১২ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছে সংগঠনটি।

জানা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এক মহাসমাবেশে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা সংগঠনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং বিচারের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ওই সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হন। তবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের দাবি, শুধু শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হন। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে অধিকারের তৎকালীন সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান ও এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করে সরকার।

এদিকে, হেফাজতের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ঘটনায় ঢাকাসহ ৭ জেলায় ৫৩টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ৪৯টির এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষের পর আরও ২২১টি মামলা হয়। সব মিলিয়ে হেফাজতের বিরুদ্ধে মামলা দাঁড়িয়েছে ২৭০টি।

সম্প্রতি হেফাজতের শীর্ষ নেতা মাওলানা মামুনুল হক ঢাকায় দায়ের হওয়া ৪৫টি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর শাখার সুপারিশক্রমে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিষয়টি পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আরও ৬–৭টি মামলা যুক্ত করে দ্বিতীয় দফায় তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পিপি ওমর ফারুক ফারুকী।

ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ জানান, আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী প্রাপ্ত মামলাগুলোর প্রত্যাহারের প্রস্তাব পুনরায় পিপির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২২০টি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে, আরও প্রায় ৫০টি মামলা রয়েছে যেগুলোর আবেদন প্রক্রিয়াধীন।

২০১৩ সালের ঘটনার পর হেফাজতের বহু শীর্ষ নেতা ও সহস্রাধিক কর্মী গ্রেপ্তার হন। এর মধ্যে রয়েছেন—মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজাহার, মাওলানা কামরুদ্দিন, মাওলানা মিজানুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মাদানী ও মুফতি সাখাওয়াত হুসাইন রাজী। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধিকাংশ নেতা-কর্মী জামিনে মুক্তি পেলেও, এখনও কয়েকজন কারাবন্দী আছেন বলে জানান মামুনুল হক।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সমাবেশে মামুনুল হক বলেন, “আগামী দুই মাসের মধ্যে হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে হেফাজত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।”

একই সমাবেশে মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, “শাপলা চত্বরে যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। আমরা এর বিচার চাই।”

ট্রাইব্যুনালে মামলা

২০২৫ সালের ১২ মার্চ হেফাজতে ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মিস কেস (বিশেষ আবেদন) দায়ের করেছে। মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নয়জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, বেনজীর আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

তাদের মধ্যে টুকু, শহীদুল হক, জিয়াউল আহসান ও মোল্যা নজরুল ইসলাম আগে থেকেই অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন। বাকি পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

শাপলা চত্বরে নৃশংসতার ১২ বছর

Update Time : ১০:৩৭:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ মে ২০২৫

০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের জমায়েত এবং পরবর্তীতে সংঘর্ষের ১২ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছে সংগঠনটি।

জানা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এক মহাসমাবেশে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা সংগঠনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং বিচারের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ওই সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হন। তবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের দাবি, শুধু শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হন। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে অধিকারের তৎকালীন সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান ও এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করে সরকার।

এদিকে, হেফাজতের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ঘটনায় ঢাকাসহ ৭ জেলায় ৫৩টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ৪৯টির এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষের পর আরও ২২১টি মামলা হয়। সব মিলিয়ে হেফাজতের বিরুদ্ধে মামলা দাঁড়িয়েছে ২৭০টি।

সম্প্রতি হেফাজতের শীর্ষ নেতা মাওলানা মামুনুল হক ঢাকায় দায়ের হওয়া ৪৫টি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর শাখার সুপারিশক্রমে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিষয়টি পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আরও ৬–৭টি মামলা যুক্ত করে দ্বিতীয় দফায় তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পিপি ওমর ফারুক ফারুকী।

ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ জানান, আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী প্রাপ্ত মামলাগুলোর প্রত্যাহারের প্রস্তাব পুনরায় পিপির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২২০টি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে, আরও প্রায় ৫০টি মামলা রয়েছে যেগুলোর আবেদন প্রক্রিয়াধীন।

২০১৩ সালের ঘটনার পর হেফাজতের বহু শীর্ষ নেতা ও সহস্রাধিক কর্মী গ্রেপ্তার হন। এর মধ্যে রয়েছেন—মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজাহার, মাওলানা কামরুদ্দিন, মাওলানা মিজানুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মাদানী ও মুফতি সাখাওয়াত হুসাইন রাজী। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধিকাংশ নেতা-কর্মী জামিনে মুক্তি পেলেও, এখনও কয়েকজন কারাবন্দী আছেন বলে জানান মামুনুল হক।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সমাবেশে মামুনুল হক বলেন, “আগামী দুই মাসের মধ্যে হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে হেফাজত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।”

একই সমাবেশে মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, “শাপলা চত্বরে যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। আমরা এর বিচার চাই।”

ট্রাইব্যুনালে মামলা

২০২৫ সালের ১২ মার্চ হেফাজতে ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মিস কেস (বিশেষ আবেদন) দায়ের করেছে। মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নয়জনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, বেনজীর আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

তাদের মধ্যে টুকু, শহীদুল হক, জিয়াউল আহসান ও মোল্যা নজরুল ইসলাম আগে থেকেই অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন। বাকি পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল।